ট্রাম্পের অভিবাসননীতি

মার্কিন শ্রমবাজার থেকে সাত মাসে উধাও ১২ লাখ কর্মী

শ্রম দিবস উপলক্ষে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আয়োজিত হয়েছে প্যারেড ও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান।

শ্রম দিবস উপলক্ষে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আয়োজিত হয়েছে প্যারেড ও বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান। এমন সময় মার্কিন অর্থনীতিতে শ্রমিকদের অবদান স্মরণ করা হচ্ছে যখন সাত মাসে দেশটির শ্রমবাজার থেকে বাদ পড়েছে ১২ লাখ অভিবাসী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসননীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়াকড়ির কারণে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে শ্রমবাজার। খবর এপি।

ইউএস সেনসাস ব্যুরো প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে পিউ রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমশক্তি থেকে ১২ লাখের বেশি অভিবাসী হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে বৈধ-অবৈধ দুই ধরনের অভিবাসীই রয়েছে।

মার্কিন শ্রমশক্তির প্রায় ২০ শতাংশ অভিবাসী। পিউ রিসার্চের জ্যেষ্ঠ গবেষক স্টেফানি ক্রেমার জানিয়েছেন, দেশটির কৃষি, মৎস্য ও বনজ খাতের কর্মীদের ৪৫ শতাংশ বা প্রায় অর্ধেকই অভিবাসী। নির্মাণ ও সেবা খাতে এর পরিমাণ যথাক্রমে ৩০ ও ২৪ শতাংশ।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা রেকর্ড ১ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছায়। এরপর এবারই প্রথম দেশটিতে অভিবাসীর মোট সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। স্টেফানি ক্রেমার বলেন, ‘জানুয়ারির পর থেকে কমে যাওয়া অভিবাসীদের কতজন স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে গেছে বা বহিষ্কার হয়েছে, তা গণনায় ঠিকমতো উঠে না আসা অথবা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটির শিকার কিনা স্পষ্ট নয়। তবে প্রাথমিক তথ্যে বড় ধরনের ভুল হওয়া সম্ভব নয়।’

নির্বাচনী প্রচারণাকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে কর্মরত অভিবাসীদের বহিষ্কার করবেন। লক্ষ্য হিসেবে ‘বিপজ্জনক অপরাধী’দের উল্লেখ করলেও বাস্তবে মার্কিন অভিবাসন সংস্থা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) হাতে ধরা পড়া বেশির ভাগ বিদেশীরই অপরাধের রেকর্ড নেই। একই সঙ্গে সীমান্ত পার হওয়া অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা তীব্রভাবে কমেছে।

অর্থনীতিতে এর প্রভাব সম্পর্কে ডালাস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের শ্রম অর্থনীতিবিদ পিয়া অরেনিয়াস বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে কমপক্ষে ৫০ শতাংশের জোগান দেন অভিবাসীরা। সীমান্ত দিয়ে অভিবাসী প্রবাহ কার্যত থেমে গেছে। অথচ গত চার বছরে এ পথেই লাখ লাখ অভিবাসী এসেছিল। এটি মার্কিন অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতায় বিশাল প্রভাব ফেলেছে।’

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে অভিবাসী শ্রমিক কমে যাওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মেক্সিকো সীমান্ত লাগোয়া টেক্সাসের ম্যাকঅ্যালেনে ভুট্টা ও তুলার ক্ষেত থেকে ফসল কাটার জন্য প্রস্তুত। সেখানে ন্যাশনাল ফার্মওয়ার্কার মিনিস্ট্রির পক্ষে খামার শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করেন এলিজাবেথ রদ্রিগেজ। তিনি জানিয়েছেন, এবার খামারের যন্ত্র চালানোর মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাবে না। অভিবাসনবিষয়ক অভিযানে খামার, ব্যবসা ও নির্মাণ খাতে সব কাজ থমকে গেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার ভেনচুরা কাউন্টিতে পারিবারিক ব্যবসা সামলান লিসা টেইট। আটটি খামারে মোট ৮০০ একর জমিতে সাইট্রাস, অ্যাভোকাডো ও কফি ফলান তারা। লিসার খামারের অধিকাংশ শ্রমিক আসেন ঠিকাদারদের মাধ্যমে। এরই মধ্যে শ্রমিক সরবরাহ কমে গেছে। লিসা টেইট সরাসরি অভিবাসননীতিকে দায়ী না করলেও বলছেন, আইসিইর অভিযানের কারণে দ্রুত ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

সরকারি কর্মসংস্থান তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্মাণ খাতের সংগঠন অ্যাসোসিয়েটেড জেনারেল কন্ট্রাক্টরস অব আমেরিকা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক মহানগর এলাকায় নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড–সান বার্নার্ডিনো–অন্টারিও এলাকায়। এ খাতে কর্মসংস্থান কমেছে ৭ হাজার ২০০।

সংগঠনের প্রধান অর্থনীতিবিদ কেন সাইমনসন বলেন, ‘নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান নানা কারণে স্থবির বা কমে গেছে। ঠিকাদাররা বলছেন, কঠোর অভিবাসননীতি প্রয়োগ শ্রম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। নইলে পর্যাপ্ত পরিমাণ দক্ষ ও কাজ করতে ইচ্ছুক শ্রমিক পাওয়া যেত।’

পিউ–রিসার্চের ক্রেমার সতর্ক করেছেন, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব স্বাস্থ্যসেবা খাতেও পড়তে পারে। কারণ বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসেন এমন কর্মীদের ৪৩ শতাংশই অভিবাসী।

যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি খাত ও সম্পত্তি সেবায় প্রায় ২০ লাখ কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন (এসইআইইউ)। সংস্থার ক্যালিফোর্নিয়ায় শাখার দীর্ঘমেয়াদি যত্ন প্রদানকারী কর্মীদের অর্ধেকের মতোই অভিবাসী। শাখা প্রেসিডেন্ট আর্নুলফো ডে লা ক্রুজ প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘যখন লাখ লাখ মার্কিন আর ঘরে বসে সেবাদাতা পাবেন না, তখন কী হবে?’

আরও